জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতিতে যখন সাধারণ মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা, ঠিক তখনই খরচ এবং দাতাদের অনুদানের দিক থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনে পরিণত হতে যাচ্ছে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অর্থের হিসাব রাখা গবেষণা সংস্থা ‘ওপেনসিক্রেটস’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রার্থী এবং বাইরের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো প্রচারণা চালাতে রেকর্ড প্রায় ১২ বিলিয়ন (১,২০০ কোটি) ডলার খরচ করেছে।
নির্বাচনী অর্থায়নের নথি অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলোন মাস্ক একাই রিপাবলিকানদের ৪৪৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছেন।
যেখানে অধিকাংশ প্রচারণায় সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের সংকট ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়, সেখানে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, বর্তমান নীতি ধনী দাতা, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোকে প্রার্থী নির্বাচন এবং নীতি নির্ধারণের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
কেন এই নির্বাচনে এত বিপুল অর্থ ব্যয়?
মার্কিন নির্বাচনে মূলত দুটি উপায়ে অর্থায়ন করা হয়:
১. প্রার্থীদের সরাসরি তহবিল সংগ্রহ: ওপেনসিক্রেটস-এর তথ্য অনুযায়ী, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা যেখানে ২.২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করার আভাস পাওয়া গেছে, সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থীরা খরচ করছেন প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার। ২. বাহ্যিক ব্যয় (Outside Spending): এই প্রক্রিয়ায় কর্পোরেশন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সংস্থা প্রার্থীদের প্রচারণার বাইরে থেকে আলাদাভাবে অর্থ খরচ করে।
পূর্বে দুর্নীতি প্রতিরোধে নির্বাচনে সংস্থাগুলোর বিজ্ঞাপনী অর্থায়নে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু ২০১০ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেই নিয়ম বাতিল করে নির্বাচনী প্রচারণাকে বাকস্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নিম্নাদালতের পরবর্তী এক রুলিংয়ে বলা হয়—প্রার্থীদের সাথে সরাসরি সমন্বয় না করা পর্যন্ত এসব গোষ্ঠী কত টাকা সংগ্রহ করতে পারবে, তার ওপর কোনো সীমা নির্দিষ্ট থাকবে না।
এর পর থেকে গত এক দশকে (২০১৬ সালের ৪.১২ বিলিয়ন ডলার থেকে) এই বাহ্যিক ব্যয় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালে আনুমানিক ১১.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই ব্যয় মূলত পরিচালনা করে ‘সুপার প্যাক’ (Super PACs) নামে পরিচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক কমিটি।
সুপার প্যাক এবং ‘ডার্ক মানি’-র প্রভাব
অধিকাংশ সুপার প্যাক রাজনৈতিকভাবে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান দলের সাথে সম্পর্কিত:
-
রিপাবলিকান সমর্থক বড় সুপার প্যাক: সেনেট লিডারশিপ ফান্ড (৪৮ঐ মিলিয়ন ডলার) এবং মাগা ইনক (৩৫৩ মিলিয়ন ডলার)।
-
ডেমোক্র্যাট সমর্থক বড় সুপার প্যাক: সেনেট মেজরিটি প্যাক (২৪৮ মিলিয়ন ডলার) এবং হাউস মেজরিটি প্যাক (১৯২ মিলিয়ন ডলার)।
ব্যক্তিগতভাবে ইলোন মাস্কের ‘আমেরিকা প্যাক’ (America PAC) এবং জর্জ সোরোসের ‘ডেমোক্রেসি প্যাক’ (Democracy PAC)-ও এতে যুক্ত।
প্রচারণার খরচের আগে অর্থ একাধিক সংস্থা ও “শেল প্যাক” (Shell PACs)-এর মাধ্যমে ঘুরিয়ে আনা হয়, ফলে আসল উৎস জানা সম্ভব হয় না। এই উৎসহীন অর্থকে “ডার্ক মানি” (Dark Money) বলা হয়। ওপেনসিক্রেটস-এর মতে, এবারের নির্বাচনে “ডার্ক মানি”-র পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০২৪ সালের ১.৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ভাঙবে।
AIPAC-কে ঘিরে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী সুপার প্যাক ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (AIPAC)-এর বিরুদ্ধেও শেল প্যাকের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের (বিশেষ করে যারা ফিলিস্তিনের সমর্থক) হারাতে তারা রিপাবলিকান দাতাদের সংগৃহীত অর্থ ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে নিউইয়র্কের প্রগতিশীল প্রার্থী জামাল বোম্যানের বিরুদ্ধে জর্জ ল্যাটিমারের প্রচারে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার এবং মিসৌরিতে কোরি বুশের বিরুদ্ধে ওয়েসলি বেলকে জেতাতে ৫.২৪ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে AIPAC-র সহযোগী সংস্থা।
এর জবাবে ‘রিজেক্ট AIPAC’ নামের প্রগতিশীল জোট প্রার্থীদের আহ্বান জানিয়েছে AIPAC বা এর সম্পর্কিত প্যাকগুলো থেকে অনুদান না নেওয়ার জন্য।
সবচেয়ে বেশি ব্যয় যেখানে
সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোতে (Toss-up states)—যেমন জর্জিয়া, টেক্সাস এবং মিশিগান। মিশিগানে সেনেট আসনে রিপাবলিকান মাইক রজার্স এবং ডেমোক্র্যাট আব্দুল এল-সায়েদের লড়াইয়ে রেকর্ড ৩৩৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
অথচ বর্তমানে দুই দলের সাধারণ ভোটারদের মূল চিন্তা জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতি। ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম ও খাবারের দাম আকাশচুম্বী।
সামাজিক মাধ্যম X-এ এক ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন:
“স্কুল বা স্বাস্থ্যসেবার জন্য টাকা নেই বলা হলেও কীভাবে ১২ বিলিয়ন ডলার একটা নিরর্থক প্রচারণায় অপচয় করা হয়?”
এই ১২ বিলিয়ন ডলার অন্য কোথায় কাজে আসতে পারতো?