বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারনির্ভর। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম জাপান।
প্রশ্ন হলো, জাপান কি সত্যিই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের পরবর্তী বড় বাজার হয়ে উঠতে যাচ্ছে? বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও রপ্তানির ওঠানামার চিত্র উঠে এসেছে।
চার বছরের রপ্তানিতে ওঠানামা
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির আয়ে ওঠানামা দেখা গেছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বিভিন্ন কারণে রপ্তানি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে, জাপানের বাজারে রপ্তানিতে আবার ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এ সময় রপ্তানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে।
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও রপ্তানি কমে যায়। এ সময় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে রপ্তানি দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে। একই অর্থবছরে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে ইতিবাচক ধারা
গত কয়েক বছরের ওঠানামার মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে।
ইপিবির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত, বাংলাদেশ জাপানে ৩৪৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এ সময়ে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জাপানের বাজারে গেছে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ।
গত চার বছরের যেকোনো একক প্রান্তিকের তুলনায় এটি জাপানের বাজারে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি।
জাপানের পোশাক আমদানির চিত্র
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা বোঝার পাশাপাশি বিশ্ববাজার থেকে জাপানের মোট পোশাক আমদানির পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত জাপান বিশ্ববাজার থেকে ২৪ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। পরবর্তী বছর, ২০২৩-২৪ সালে, বিশ্বব্যাপী পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশটির পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে। এরপর ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানের পোশাক আমদানি পরপর দুই বছর বাড়ে। এ দুই বছরে আমদানি যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট- এই দুই মাসে জাপান বিশ্ববাজার থেকে ৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি মান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
উদ্যোক্তারা বলছেন, জাপানের মতো বড় ও বিশ্বস্ত অর্থনীতির দেশে পোশাকের সামগ্রিক আমদানি আবারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। পাশাপাশি চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অংশ বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছানোও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের গুণগত মান ও ফিনিশিং নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মেনে চলতে পারলে এ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এতে প্রথাগত পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাপান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বড় ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।