খাগড়াছড়ির সাজেক সড়কে টানা ৯ দিন ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ একদিনের জন্য শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি। আগামী ১ নভেম্বর রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিল থাকবে।
তবে ২ নভেম্বর থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠন দুটির নেতা বাবুধন চাকমা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে তিনি এ ঘোষণা দেন।
বাবুধন চাকমা বলেন, দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে সাজেক ইউনিয়নের বাসিন্দারা খাদ্যসংকটে পড়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত ফল ও ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এবং কৃষকদের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একদিনের জন্য অবরোধ শিথিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। এরপর ২ নভেম্বর থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, যেসব এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে, সেসব এলাকায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও অবরোধ শিথিল রাখা হবে।
গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ পালন করছে। সংগঠন দুটির অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যরা সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন। তাদের সরিয়ে নেওয়াসহ প্রথমে তিন দফা এবং পরবর্তী সময়ে আরও দুই দফা দাবি জানিয়ে এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
টানা অবরোধে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র সাজেক। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে খাদ্য ও ওষুধের সংকট। দীর্ঘদিন যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কৃষি ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আইয়ুশ চাকমা জানান, সাজেক সড়ক অবরোধের কারণে শুধু যানবাহন খাতেই প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় এক হাজার গাড়িচালক ও সহকারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতেও এক হাজারের বেশি শ্রমিক ও মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সব মিলিয়ে প্রতিদিন কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত এ সংকটের সমাধান না হলে পর্যটননির্ভর সাজেকের অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
এদিকে সাজেকের চলমান সংকট নিরসনে কয়েক দফায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বাঘাইছড়িতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ বৈঠকেও অবরোধকারীদের দাবিসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান এবং রাঙামাটির পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রকিব।
ওয়াদুদ ভুঁইয়া জানান, গত ২৬ অক্টোবর সাজেক এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উজোবাজারে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত পাঁচটি দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
তিনি বলেন, সশস্ত্র সংগঠন যে-ই হোক, তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে। তবে কোনো একটি গোষ্ঠীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্য একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকার সব অবৈধ অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সাজেককে কেন্দ্র করে চলমান সংকটের পেছনে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দুইটি সশস্ত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার আলোচনায় রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে সাজেক এলাকায় ইউপিডিএফ-প্রসিত গ্রুপের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে ধারণা প্রচলিত। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপ নতুন করে ওই এলাকায় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের চেষ্টা করছে—এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের আশঙ্কা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বারবার অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটন এবং স্বাভাবিক জনজীবনে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো একটি সংগঠন বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়, বরং সব অবৈধ অস্ত্রধারী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো একটি পক্ষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা কিংবা অন্য পক্ষকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
সব পক্ষের জন্য সমানভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে এক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার পর অন্য পক্ষের তৎপরতায় আবারও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পাহাড়ের সাধারণ মানুষ।