
পূর্বাচলসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযানে ৮৫ জনকে আটকের পরও কাটছে না রহস্য। কারা, কী উদ্দেশ্যে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন।
রাজধানীর পূর্বাচলসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ের ওই বাড়িতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি), রেকিট, ফিলিপ মরিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে। অভিযানের সময় কয়েকজন গা-ঢাকা দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে তাঁদের উপস্থিতি ও বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতে, একটি বাড়িতে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এমন সমাবেশের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সেখানে কোনো অপরাধমূলক বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ছিল কি না, তাও তদন্তের বিষয়।
মাসে ১৮-২০টি ডিজে পার্টির আয়োজন
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত তিনতলা বাড়িটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। তবে বাড়িটি আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে অনুমোদনপ্রাপ্ত ছিল না। সেখানে বার ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার লাইসেন্সও ছিল না বলে জানা গেছে।
বাড়িটির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের দাবি, জন্মদিন বা গায়ে হলুদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য অনলাইনে বাড়ির উঠান ভাড়া দেওয়া হতো। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, সেখানে নিয়মিত ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক ও মদের আসর বসত।
অভিযান পরিচালনাকারী ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য, বাড়িটিতে মদ, মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ চলত। পাঁচ কক্ষের বাড়িটিতে একেকটি কক্ষে সর্বোচ্চ ১০ জন ভাড়া নিতেন। অতিরিক্ত ব্যক্তির জন্য জনপ্রতি ৬০০ টাকা নিবন্ধন ফি নেওয়া হতো। দুপুর ১২টা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত চলা এসব আয়োজনে মাসে গড়ে ১৮ থেকে ২০টি অনুষ্ঠান হতো। প্রতিটি অনুষ্ঠান থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তল্লাশির সময় বাড়িটি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
৮৫ জনকে সাজা, কারাগারে পাঠানো হয়েছে
গত সোমবার রাতে বাড়িটিতে অভিযান চালায় ডিবির একটি দল। অভিযান বন্ধ করতে অতিরিক্ত ডিআইজি জহির বিভিন্নভাবে তদবির করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে ডিবি অভিযান অব্যাহত রাখে।
পরে সেখান থেকে ৫৯ পুরুষ ও ২৬ নারীসহ মোট ৮৫ জনকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পুরুষদের এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নারীদের ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়; অনাদায়ে তাদেরও আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার দণ্ডপ্রাপ্তদের কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ২৬ জনকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয়েছে। বাকিরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং একটি বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থার ট্রেইনি ক্যাপ্টেন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রেকিটের ব্র্যান্ড ম্যানেজার নাঈমুর রহমান, ফিলিপ মরিসের ম্যানেজার তাওহিদ, মারভেল কোম্পানির কমিউনিকেশন লিড মো. সাদাত এবং ইটিআই বাংলাদেশের কর্মকর্তা সাদমান বিন আহসানের নামও এসেছে। তবে তাঁদের প্রত্যেকের উপস্থিতির কারণ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আটক নারীদের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, পোশাকের ব্র্যান্ড উদ্যোক্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করা কেএম সাওফা সিলভি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর আফসানা বুলবুল, পোশাকের ব্র্যান্ড উদ্যোক্তা ফারিয়া সুন্নাহ এবং বিইউপির শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম রয়েছেন। তাদের পরিচয় ও পেশার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দেওয়া তথ্যের সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তে আটকদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য
কারা কী উদ্দেশ্যে বাড়িটিতে জড়ো হয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেনি ডিবি। সংস্থাটির প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের পেশা বা সেখানে জড়ো হওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি। দণ্ডপ্রাপ্তদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয়সংবলিত তালিকা প্রকাশের বিষয়েও ডিবির পক্ষ থেকে অনাগ্রহ দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন, ডিবির অভিযানের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা ও জরিমানা করেছেন। তাঁদের থানায় হস্তান্তর করা হয়নি এবং এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরিও হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, পেশা, সেখানে সমবেত হওয়ার উদ্দেশ্য এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে। তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকেও বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ওএসডি অতিরিক্ত ডিআইজি, সম্পদের উৎসও তদন্তে
গত মঙ্গলবার আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জহিরের জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস নিয়েও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান করছে। বাড়িটি দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের কাছে ভাড়া দেওয়া হতো; কেউ সেখানে রাতযাপন করতেন, কেউ আয়োজন করতেন পার্টি।
বাড়িটি পরিচালনার জন্য মাহবুব আলম নামে একজনকে কো-হোস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন জহির। ভাড়ার ৭০ শতাংশ তার ব্যাংক হিসাবে জমা হতো এবং বাকি ৩০ শতাংশ পেতেন মাহবুব। বাড়িটি একজন পুলিশ কর্মকর্তার হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এর কার্যক্রম নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে সাহস করতেন না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, তিনি অনলাইনে নিয়মিত বাড়িটি ভাড়া দেন এবং সেখানে কিছু কঠোর নিয়মও রয়েছে। এবার জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তবে অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি কখনো বাড়িটি ভাড়া দেননি বলে দাবি করেন।
বাড়িটিতে কারা কী উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিলেন, করপোরেট কর্মকর্তাদের উপস্থিতির সঙ্গে কোনো বিশেষ পরিকল্পনার সম্পর্ক ছিল কি না এবং বাড়িটির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায় কতটুকু—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।